অতসীদি


কেমন আছো অতসীদি ? ভালো আছো ?

শেষ দেখেছিলাম অফিসপাড়ায় -  তোমার মাথার দু একটা চুলে পাক ধরেছে চোখে হাই পাওয়ারের চশমা - চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছিলে
যেন বলবার মতো কথা নেই - চেনা মানুষদেরকেও আর চিনতে ইচ্ছে করে না

কপালে বিন্দু বিন্দু জমে রয়েছে সারা দিনের ক্লান্তি অসহায় চোখদুটিতে শুধুই অবসাদ ...

সত্যি বলতে কি, ভিড়ের মধ্যে তোমাকে আলাদা করে চিনতেই পারি নি। 

আর তোমাকে ডাকবার জন্য হন্যে হয়ে ফুটপাথ পেরোবার আগেই ভিড়ের মধ্যে তুমি হারিয়ে গিয়েছিলে
দিনান্তের সূর্য যেমন হারিয়ে যায় মা পাখীর ডানার আশ্রয়ে ...

আর ঠিক তখনই সমস্ত অফিস পাড়া আমার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠেছিল এই তোর অতসীদি ? এ তো ...  


আমাকে তোমার বোধ হয় মনে নেই
মনে থাকার কথাও না। তুমি যখন আমাদের পূর্ব কলকাতার লোডসেডিং এ মোড়া ছেঁড়াখোঁড়া হাউসিং কমপ্লেক্সের রাণী আমি তখন সবে সন্ধ্যের অন্ধকার নামা অব্দি পাড়ার মোড়ে আড্ডা মারার ছাড়পত্র পেয়েছি।

তুমি কলেজ থেকে ফিরতে ছটা সাড়ে ছটা নাগাদ কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ সানগ্লাস উঁচু করে মাথার ওপরে তুলে রাখা কচি কলাপাতা রঙের একটা সালোয়ার ছিলো পরলে দারুন দেখাতো ... তোমার বোধহয় মনে নেই..

সন্ধের ঠিক মুখে তোমার হাসি সাদা পায়রার মতো আমাদের চারপাশে আলো জ্বেলে দিত

আমরা তাতে ভিজিয়ে নিতাম আমাদের সদ্যপ্রাপ্ত যৌবন

শুদ্ধ হতাম ... গঙ্গাস্নানে যেমন শুদ্ধ হন আবালবৃদ্ধবণিতা ...


যখন পূজোর সময় নাটক হত আর তাতে তুমি অভিনয় করতে
আমার খুব ভয় করত যদি তুমি পাঠ ভুলে যাও যদি মেক আপ খুলে যায় ... যদি ...

আর যখন তুমি আবৃত্তি করতে তখন খুব ভাল লাগতো ... কবিতা জীবন্ত হয়ে উঠত তোমার পড়ায় - - মন্ত্র মুগ্ধের মতো শুনতাম ঘরেতে এলো না সে তো  ... মনে তার নিত্য আসা যাওয়া ...

একদিন দোকান থেকে ফেরার সময় ব্যাগ থেকে জিনিসগুলো ছড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল আমি কুড়িয়ে দিয়েছিলাম বলে তুমি হেসে বলেছিলে থ্যাঙ্ক ইউ ...

সেই ধন্যবাদকে সম্বল করেই একটু একটু করে আমি বড় হয়ে গেলাম।


বিয়ের সাজে তোমাকে রাণীর মত দেখাচ্ছিল
নিওনের তীব্র আলো ম্লান হয়ে গিয়েছিল তোমার চলকে পড়া হাসিতে সযত্নে ঢেকে রেখেছিলে এক অসম্ভব অভিমান আর নীল চোখে ছিল শতাব্দির ক্লান্তি

কিসের ক্লান্তি তোমার অতসীদি কার ওপর এতো অভিমান?

উত্তর পেয়েছিলাম অনেকদিন বাদে যখন নিরীহ কয়েকটি শব্দ এক ভরা দুপুরে আমাকে ভীষন একা করে চলে গিয়েছিল আর  চুয়াল্লিশ নম্বর বাসের সব্জি, মবিল এবং ঘামের গন্ধের মতো আমার দিকে কেউ ফিরেও তাকায় নি

তারপর কিভাবে যেন অভিমান নাম পালটে হয়েছে অসহায়তা
অবসাদকে সঙ্গী করে পৌছে গিয়েছি মধ্যবয়সে

এখন ঘোলাটে চোখে দৈনন্দিন হিসেব নিকেশে আমাদের পরম নির্ভরতা


তবু এতদিন বাদে যখন দেখা হয়েই গেল

থাক সেসব কথা -
জঞ্জাল থাক পড়ে দৈনন্দিন অন্দরমহলে -
বরং
আর একবার সূর্যকে লজ্জা দিয়ে ঝলমল করে হেসে ওঠো তুমি
অতসীদি
আর একবার উদ্দাত্ত গলায় গেয়ে ওঠো
পুরানো জানিয়া চেয়ো না চেয়ো না আমারে আধেক আঁখির কোলে ...

ভালো থেকো অতসীদি ভালো না থাকা অন্যদের জন্য
সে তোমায় মানায় না ...

রাহুল গুহ
৪ জুন, ২০০৬