অতসীদি
১
কেমন আছো অতসীদি
? ভালো আছো ?
শেষ দেখেছিলাম
অফিসপাড়ায় - তোমার মাথার
দু একটা চুলে পাক
ধরেছে – চোখে
হাই পাওয়ারের
চশমা - চুপচাপ হেঁটে
যাচ্ছিলে –
যেন বলবার মতো
কথা নেই - চেনা মানুষদেরকেও
আর চিনতে ইচ্ছে
করে না –
কপালে বিন্দু
বিন্দু জমে রয়েছে
সারা দিনের ক্লান্তি
– অসহায়
চোখদুটিতে শুধুই
অবসাদ ...
সত্যি বলতে
কি, ভিড়ের মধ্যে
তোমাকে আলাদা করে
চিনতেই পারি নি।
আর তোমাকে ডাকবার
জন্য হন্যে হয়ে
ফুটপাথ পেরোবার
আগেই ভিড়ের মধ্যে
তুমি হারিয়ে গিয়েছিলে
–
দিনান্তের
সূর্য যেমন হারিয়ে
যায় মা পাখীর
ডানার আশ্রয়ে ...
আর ঠিক
তখনই সমস্ত অফিস
পাড়া আমার দিকে
তাকিয়ে হেসে উঠেছিল
– “এই
তোর অতসীদি ? এ
তো ... ”
২
আমাকে তোমার বোধ
হয় মনে নেই – মনে
থাকার কথাও না।
তুমি যখন আমাদের
পূর্ব কলকাতার
লোডসেডিং এ মোড়া
ছেঁড়াখোঁড়া হাউসিং
কমপ্লেক্সের রাণী
– আমি
তখন সবে সন্ধ্যের
অন্ধকার নামা অব্দি
পাড়ার মোড়ে আড্ডা
মারার ছাড়পত্র
পেয়েছি।
তুমি কলেজ থেকে
ফিরতে ছটা – সাড়ে
ছটা নাগাদ – কাঁধে
শান্তিনিকেতনী
ব্যাগ – সানগ্লাস
উঁচু করে মাথার
ওপরে তুলে রাখা
–কচি
কলাপাতা রঙের একটা
সালোয়ার ছিলো – পরলে
দারুন দেখাতো
... তোমার বোধহয়
মনে নেই..
সন্ধের
ঠিক মুখে তোমার
হাসি সাদা
পায়রার মতো আমাদের
চারপাশে আলো জ্বেলে
দিত –
আমরা তাতে ভিজিয়ে
নিতাম আমাদের সদ্যপ্রাপ্ত
যৌবন –
শুদ্ধ হতাম
... গঙ্গাস্নানে
যেমন শুদ্ধ হন
আবালবৃদ্ধবণিতা
...
৩
যখন পূজোর সময়
নাটক হত আর তাতে
তুমি অভিনয় করতে
– আমার
খুব ভয় করত – যদি
তুমি পাঠ ভুলে
যাও – যদি মেক
আপ খুলে যায় ... যদি
...
আর যখন তুমি
আবৃত্তি করতে
তখন খুব ভাল লাগতো
... কবিতা জীবন্ত
হয়ে উঠত তোমার
পড়ায় - - মন্ত্র মুগ্ধের
মতো শুনতাম – “ঘরেতে
এলো না সে তো ... মনে
তার নিত্য আসা
যাওয়া ... ”
একদিন দোকান
থেকে ফেরার
সময় ব্যাগ
থেকে
জিনিসগুলো ছড়িয়ে
পড়ে গিয়েছিল –
আমি কুড়িয়ে
দিয়েছিলাম
বলে তুমি হেসে
বলেছিলে – “থ্যাঙ্ক
ইউ” ...
সেই
ধন্যবাদকে
সম্বল করেই একটু
একটু করে আমি
বড় হয়ে গেলাম।
৪
বিয়ের সাজে
তোমাকে রাণীর
মত দেখাচ্ছিল – নিওনের
তীব্র আলো
ম্লান হয়ে
গিয়েছিল
তোমার চলকে
পড়া হাসিতে – সযত্নে
ঢেকে রেখেছিলে
এক অসম্ভব
অভিমান আর নীল
চোখে
ছিল শতাব্দির ক্লান্তি
–
কিসের
ক্লান্তি
তোমার অতসীদি –
কার ওপর এতো
অভিমান?
উত্তর
পেয়েছিলাম
অনেকদিন বাদে – যখন
নিরীহ কয়েকটি
শব্দ এক ভরা
দুপুরে আমাকে ভীষন
একা করে চলে
গিয়েছিল – আর
চুয়াল্লিশ
নম্বর বাসের
সব্জি, মবিল এবং
ঘামের গন্ধের
মতো আমার দিকে
কেউ ফিরেও
তাকায় নি
তারপর কিভাবে
যেন অভিমান নাম
পালটে হয়েছে
অসহায়তা –
অবসাদকে সঙ্গী
করে পৌছে
গিয়েছি মধ্যবয়সে
–
এখন ঘোলাটে
চোখে দৈনন্দিন
হিসেব নিকেশে আমাদের
পরম নির্ভরতা
৫
তবু এতদিন বাদে
যখন দেখা হয়েই
গেল –
থাক সেসব কথা -
জঞ্জাল থাক
পড়ে দৈনন্দিন অন্দরমহলে
-
বরং
আর একবার
সূর্যকে
লজ্জা দিয়ে
ঝলমল করে হেসে
ওঠো তুমি –
অতসীদি
আর একবার উদ্দাত্ত
গলায় গেয়ে ওঠো
“
পুরানো জানিয়া
চেয়ো না –
চেয়ো না আমারে
আধেক আঁখির
কোলে ...”
ভালো
থেকো অতসীদি – ভালো না
থাকা অন্যদের
জন্য –
সে তোমায়
মানায় না ...
রাহুল
গুহ
৪ জুন, ২০০৬